গ্রন্থটি শেষ করার আগে, এখানে আলাদা করে একটা কথা জুড়ে দিতে ইচ্ছে করছে৷ ২রা সেপ্ঢেম্বর ২০১৯ জোকা থেকে যাচ্ছি ৫০ জওহরলাল নেহেরু রোডে একটি কাজে, কলকাতায়৷ উবের-এ বসেছি৷ বসে আছি নেহাত যাত্রী হিসেবে৷ কথায়-কথায় উনি বললেন, ‘দাদা, আমরা আমাদের প্রাপ্য সম্মান পাইনা৷ আমাদের হাতেই থাকে যাত্রীর জীবন৷ তাদেরকে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আমরা বাড়ি পৌঁছে দিই৷’
মানুষটির অসহায়তা দেখে আমার খারাপ লাগলো৷ আমি বললাম, ‘ভাই, একটা কথা বলি৷ একটা জিনিস কি আমরা ভাবি যে, বিশ্বমাতা --- যিনি আমাদের জীবন ও সেই সাথে সবরকম প্রয়োজনীয় জিনিস দেন অকাতরে নিঃস্বার্থভাবে, তাঁকে কেউ খেয়ালে আনি না, মর্যাদা দেওয়া তো দূরের কথা, আর তাঁর ত্যাগের তুলনায় আমাদের ত্যাগ অনেক তুচ্ছ৷ আমরা যদি সম্মান না পাই একে অপরের থেকে, সেখানে কষ্টের কী আর আছে! তাঁর গোপন অভিমান ও কষ্টের কথা কী আমরা একটুও ভাবি!’
ড্রাইভার আমার কথায় চমকে গেলেন, বললেন, ‘এমন কথা তো আমি আগে শুনিনি!’ বলেই উনি একটা অন্যরকম অনুভবে যেন ভেসে গেলেন, এবং উনি বললেন যে তাঁর সব দুঃখ ঐ কয়েকটি কথাতে চলে গেলো!
এবার আমি বললাম যে, প্রতিটি পেশায় নিযুক্ত মানুষেরা কোনো কোনো ভাবে অপমান সহ্য করে টিকে থাকেন, আর সেইসব সমস্যার সমাধান হবে একমাত্র পৃথিবীকে যদি আমরা সম্মান দিই৷
আমি বুঝলাম, পৃথিবীর প্রতি সবার ভালোবাসার ইচ্ছে গোপনে ওৎ পেতে আছে, একটু জাগিয়ে দিলেই জেগে উঠবে৷ আর মানুষ যেন কোনো এক বিশেষ পথের সন্ধান খুঁজে বেড়াচ্ছে, যে-পথে সে সব ক্ষুদ্রতাগুলিকে বিদায় দিতে চায়৷
এবার আর একটা কথা বলি, এই সময়ের কাহিনি৷ করুণ কাহিনি৷ সম্প্রতি বিশ্বের সেরা রেনফরেষ্ট আমাজন জ্বলছে৷ বনের প্রাচীন আদিবাসী সহ পশু পাখি কীট সকলেই আতঙ্কে বেরিয়ে আসছে জঙ্গল থেকে৷ এ নিয়ে সারা পৃথিবীতে মানুষ আতঙ্কিত৷
ছোট্ট নদীতে নেমে গেছে ব্রাজিলের এক সৈনিক৷ কারণ এখানে---ওখানে জ্বলছে আমাজন৷ এ সময় হঠাৎ করে ঝাঁপ দিল একটা বাঘ ঐ জলে৷ সৈনিকটি ভয় তো পাবেই৷ কিন্তু বাঘটি সাঁতরে আসছে সৈনিকের দিকে৷ সৈনিকটি ভাবলো যে তাকে এবার খাবে বাঘটি৷ কিন্তু না, বাঘটি সৈনিকটিকে আকুল ভাবে জড়িয়ে ধরে৷ কারণ সে বুঝেছিল যে, সে বাঁচতে চায়, আর এই মানুষ নামক জীবটিই তাকে একমাত্র বাঁচাতে পারে৷
সে ভুলে গেলো হিংস্রতা৷ মানুষটির ভয় কেটে গেলো৷ দুজনে এইভাবে চলে গেলো জলে হেঁটে হেঁটে নিরাপদ স্থানে৷ বাঘটি সৈনিকটিকে আদর করে জড়িয়ে ধরে থাকে৷
এই দৃশ্য অনেকে অনেক ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন এবং এটি সারা পৃথিবীতে ভাইরাল হয়েছে৷ এখানে আমার বিশ্লেষণ হল, বাঘের মতো হিংস্র জীব পৃথিবীর বিপদে এতোটাই আতঙ্কিত যে, সে নিজের খিদে ভুলে গেছে৷ তার হিংস্র অভ্যেস ভয়ে চুপসে গেছে৷
তাহলে আমরা মানুষেরা পৃথিবীকে কোন মাত্রায় বিপদে ঠেলে দিয়েছি!
প্রতিদিন বিজ্ঞানীরা নানাভাবে আমাদের সতর্ক বার্তা দিচ্ছেন, কীভাবে পৃথিবীটা আমাদের বদ অভ্যেসের জন্য ক্রমশ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে! আর তার ফলস্বরূপ বিজ্ঞানীরা ভিনগ্রহে বসবাস করার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন!
এরপর-ও আমরা ভাববো যে, আমরা ঠিক পথে চলেছি!
এখানেই আমার ভাবনা হল যে, বাঘ তার বাঁচার প্রয়োজনে যদি খিদে ভুলে মানুষকে আঁকড়ে ধরে, তবে আমরা কবে বুঝবো যে, পৃথিবীকে আমরা কবে এইভাবে আঁকড়ে ধরব!
এবার এখানে একটা কথা বলি, হয়তো একটু অগোছালো হতে পারে, কারণ এই কথাগুলি গ্রন্থের ভিতরে আরো আগে, কোথাও দিলে ভালো হোতো৷ কিন্তু এ বিষয়টি এমন বহুমাত্রিক যে, এই রকম একটু অগোছালো ধরনটাই এখানে স্বাভাবিকতা আনতে পারে বা পেরেছে৷
কলকাতা হাই কোর্টের মহুরী সুজিত সরকার, সুদীর্ঘ বৎসর ধরে তিনি এই পেশায় আছেন, তিনি অনেক আগেই আমার সাথে পরিচয়ের পর আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনার এই বিষয়ের ওপর কোনো গ্রন্থ প্রকাশ করা উচিত৷ কারণ, বিষয়টি খুব জরুরী৷’
আজ, তাঁর কথা খুব মনে পড়ছে৷
একটু আগের কাহিনী দিয়েই গ্রন্থটি শেষ করা যাক৷
আমি ২০১৭-তে প্রথম পৃথিবীর জন্মদিন-এর অনুষ্ঠানের পর ভেতর থেকে অস্থির হয়ে পড়লাম৷ এই সফলতার সুস্থিরতার সাথে সাথে অনেক কাজের দায়দ্বায়িত্ব বেড়ে গেলো৷
ভাবলাম, আমার এই যে বিপ্লব, মানুষকে তার অভ্যেস বদলানোর বিপ্লব, এটা কি শুধু এই আনুষ্ঠানিক দিবস উদযাপনের মধ্য দিয়েই সম্ভব হবে! কখনোই নয়৷
তবে, এই দিবস পালন করলে মানুষের ভিতর পৃথিবীকে ভালোবাসার জন্য হুঁস প্রক্রিয়াটা কাজ করবে, সবসময়৷
কিন্তু বাকি কাজগুলি খুব গভীর ও পরিশ্রমের৷
আমি মন থেকে তৈরি হতে থাকলাম৷ যোগাযোগ করতে শুরু করলাম নানা স্থানে৷ ভারতের সাথে আমার সামাজিক যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল এইসময়৷
আমি একদিন ভাবলাম, যদি ছাত্রছাত্রীদের মাঝে আমি এই বিষয়টিকে তুলে ধরতে পারি তাহলে, আমার স্থায়ী বিশ্বশান্তির পদ্ধতিকে ছড়িয়ে দিতে পারবো৷ কারণ, ওরা সংসারের জটিল কুটিলতায় প্রবেশ করেনি৷
মানি, যাঁরা গৃহস্থ মানুষ, তাঁদের মন বড় হতে পারে, অর্থনৈতিক সামর্থে পরিপূর্ণ, স্বস্তির জীবন তাঁদের৷ কিন্তু সামাজিক জটিলতায় তাঁরা বন্দি৷ তাঁদের পূর্ণ ইচ্ছে থাকলেও অনেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারবেন না৷ যদি পারেন সকলেই, তার চেয়ে সুখের খবর আর কী বা থাকতে পারে!
কিন্তু আমাকে ভাবতে হবে, যে-ভাবে চারিদিকে দেশ-বিশ্ব চলছে তার ওপর৷
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, শিক্ষালয়গুলিতে যাবো৷ এখন একা৷ পরে সহযোগীদের নিয়ে৷ যে-ভাবে সময় ও পরিস্থিতি দেখব, সে ভাবেই বিচার করব৷
এদিকে মাথায় চিন্তা, আমার সব টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে৷ এজন্য দুঃখ করি না৷ সেই জন্য তো পথে নেমেছি৷ কিন্তু এভাবে আর কতদিন!
আসলে আমি যে-পরিস্থিতির সাথে চলেছি বা জীবনের যে অধ্যায়ে ঢুকে পড়েছি, তাতে অনেক খরচ৷
সেই সাথে সঙ্গীসাথীদের নিয়ে সেই মতো খরচ৷ কাজের জন্য-ই৷ কিন্তু বাহারটা খুব বেড়ে গেছে৷ ২০১৯ সাল পর্যন্ত আমি কত খরচ করেছি, সেটা মনে না আনাই ভালো, সেই সাথে তিন বছর ধরে কাজ ছেড়ে আছি৷ নিউজিল্যান্ডে থাকাকালীন প্রায় চার বছর ধরে আমি দুটো সিফটে কাজ করতাম৷ ঘুমাতে পেতাম না৷ ছুটি নিতাম না৷ জার্নিটাও ছিল খুব ভোগান্তির৷ কারণ, বাসা থেকে দুটি কর্মক্ষেত্রের মধ্যে একটি ছিল অনেক দূর৷ তাই একটি কাজের জায়গা থেকে ফিরে বিশ্রাম নিয়ে রাতেরে খানিকক্ষণ বিছানাটা স্পর্শ করে আবার পরের কাজের জায়গায় দৌড় দিতাম৷ ওখানে আমি মনে হয় মোট মাত্র সাত দিনও ছুটি নিইনি৷
কারণ, আমার কোনোও ছুটির দিন ছিল না৷ মানে ছুটি নিতাম না৷ পরের চার বছর সময় যদিও একটা সিফটে কাজ করতাম, কিন্তু এক দিনও ছুটি নিই নি৷ একটা সিফটে যেখানে কাজ করতাম, সেখানেই আবার চব্বিশ ঘন্টাই আমাকে মানসিক ভাবে কাজের মধ্যে থাকতে হোতো৷ কারণ, সেখানে ব্যবস্থাপনাটা এরকম-ই ছিল৷
সাতাশটি দেশ ছুঁয়েছি, জাহাজে চাকরি করা কালীন ও তার পরে, তার মধ্যে অনেকগুলি দেশ ঘুরে দেখেছি, সেই সাথে ওই সব দেশে খরচ সামলে টাকা জমানো, ভাবা যায় না৷ সকলেই বিপন্ন, এই মানব সমাজের কঠিন অবস্থার জন্য৷ তাই অনেকের ইচ্ছে আমার পাশে দাঁড়ানো, অনেকে পেরে ওঠেন না, অনেকে সামান্য হলেও কোনোভাবে এখন আমার জন্য খরচ করতে চান৷ আসলে আমার জন্য নয়, বিশ্বমাতার শান্তির কারণের জন্য তাঁরা ওই খরচ করতে চান, এটাই আসল কথা৷
তাই তাঁরা যে যতটুকু করেন, সেটাই যথেষ্ট৷ পরপর তাঁরা নিজেদের আরো মেলে ধরবেন, নিজেদের মতো করে, এটাই সত্য৷
এখানে একটা মজার কাহিনি হোলো, আমরা পরিচিত অস্ট্রেলিয়ার পরিচিতদের ভিতরে সব চেয়ে হিসেবি জানতাম, বাংলাদেশ থেকে আগত অস্ট্রেলিয়ার-নাগরিক শামিম হোসেন কেসিমকে৷ শুনেছি তাঁর হাত থেকে নাকি এক টাকাও বের করা যায় না৷ এটা শামিম ভাই এর দোষ নয়, সারা পৃথিবীতে যে সব সঙ্কট দেখা যাচ্ছে ক্রমশ, সেখানে আমরা নিজেরটা নিয়েই শুধু ভাবি৷ তাও, অন্য বন্ধুরা অনেক সময় নিজেদের মতো কখনো কখনো টাকা পয়সা এদিক ওদিক করে, সেখানে শামিম ভাই একেবারে নয়৷ সেই শামিম ভাই ২০১৮ ও ২০১৯-এর অনুষ্ঠানের জন্য কী ভেবে আমাকে দিল একশ ডলার৷ ভারতীয় মূল্যে পাঁচ হাজার টাকা মতো৷ এর মানে আমরা মানুষের ভিতর পরপর আমাদের ভাবনা ও কাজের উদ্দেশ্য নিয়ে আস্থা অর্জন করতে পারছি৷
আসলে আমি যখন প্রথমে এই কাজে নামি তখন অনেকে বিশ্বাস রাখতে পারেন নি, কারণ অনেকেই সমাজের ভালো কাজ করার জন্য নেমে বিশ্বাস ভঙ্গ করেন, হয়তো সকলে নয়, কেউ কেউ করেন, আর সেই ছবি আমি হবো কিনা সেটাই অনেকের মাথায় খেলত, কারণ, তাঁরা অনেকে বাস্তবের ভুক্তভোগী৷
অস্ট্রেলিয়া থেকে শুভদা মানে সুকান্তরঞ্জন পাল, আমাকে ২০১৮-তে শেষের দিকে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে পাঁচ তারা হোটেলে একদিন একরাত খরচ কাটানোর খরচ বহন করেন৷ উনি সে খরচ হোটেলেই পাঠিয়ে দেন৷
পাঁচতারাতে থাকলে বা খেলে আমার কোনো লাভ নেই, কারণ এই ভাবে মানুষের গুরুত্ব বাড়ে না, কিন্তু আমাকে তিনি একটা উপহার হিসেবে এটা করলেন এবং যতটুকু হোক, ওখান থেকে তিনি একটা পরিমাণের অর্থ আমার ফাইন্ডেশনকে পাঠিয়েছেন, অনেকের থেকে চাঁদা নিয়ে৷
আমি ওই সব দেশে কাটিয়েছি এবং নিউজিল্যান্ডের নাগরিক, ওখানকারই পাসপোর্ট, সুতরাং ওই সব দেশে কীভাবে টিকে থাকতে হয় জানি৷ ব্যবস্থা খুব উন্নত৷ সমাজ ব্যবস্থা খুব স্বাভাবিক৷ কিন্তু কিছু কিছু বিষয়ে আবার আমরা আর এক রকম৷ ওখানে টাকা ধার পাওয়া খুব কঠিন৷ সব চেয়ে বড় কথা, যারা অন্য দেশ থেকে গিয়ে ওইসব দেশে নাগরিক হয়েছে, তারা তো খুব হিসেব করে চলতে বাধ্য, সেটা আমি বুঝি৷
তবু, তার মধ্যে থেকে যাঁরা একটু একটু করে এগিয়ে আসছেন, সকলকে জানাই আমার আন্তরিক ধন্যবাদ৷
আবার, এই কাজের প্রতি যত বিশ্বাস আসবে তাঁদের, ততটাই তাঁরা আরো দুঃসাহসিক হয়ে নেমে পড়বেন এই বিষয়ে, তাঁদের নিয়মে তাঁরা অনেক কিছু করতে চাইবেন, কারণ পৃথিবীটা যতটা আমার, ততটা তাঁদের৷
যে কথায় ছিলাম আগে, এই অধ্যায়ের প্রথমে, শিক্ষালয়ে আমি গিয়ে এই বিষয়কে আমি বোঝাতে চেয়েছি৷ এব্যাপারে আমাকে মুর্শিদাবাদে যেতে সাহায্য করেছেন পলাশির আব্দুস সাত্তার সাহেব৷ কোনো মানুষের বয়স-ধর্ম-রঙ নিয়ে কোনো আলোচনা আসে না কোনো কাজের ক্ষেত্রে, কিন্তু এখানে এই কারণে উল্লেখ করছি কিছু কথা৷ সামাজিক নিয়মে ওনার বয়স প্রায় আশি-নব্বুই, ধর্মের প্রচলিত নিয়মে উনি সরকারি খাতায় ইসলাম লেখেন, কারণ, এইসব না লিখলে সরকারি ভাবে আপনি কোনো কাগজের আদান প্রদান করতে পারবেন না, কিন্তু উনি আমাকে সহযোগিতা করতে রাজি হলেন৷ উনি একজন কবি ও সমাজসেবী, অনেক সভায় যান ও ব্যবস্থাপনায় থাকেন৷ উৎসাহ দান ও সহযোগিতার হাত সকলের দিকে সমান৷ ভালে কিছুর জয় হোক, এটাই এঁরা চান৷ এটাই এঁদের কাছে ধর্ম৷
এবার আসি আর একজন, মুর্শিদাবাদের কবি-সম্পাদক সৈয়দ শিষ মহম্মদের কথায়৷ উনিও অনেক উৎসাহিত করেন৷ উনি দেশের একজন বিখ্যাত সমাজসেবী ও কবি সৈয়দ আহসান আলির সন্তান৷ ওঁনাদের পরিবার এমন পরিবার, যাঁরা জাত ধর্ম নিয়ে ভাবেন না৷ সৈয়দ আহসান আলির নামে স্মৃতি পুরস্কার আছে৷ আলি সাহেব সব ধর্মের লোকদের বোঝাতেন যে, ধর্ম মানে মানব ধর্ম৷ আর সব মিথ্যে৷ সবচেয়ে বড় কথা, আমরা কোনো দেবদেবী বিশ্বাস করি বা না করি, কোনো ধর্মগ্রন্থকে কতটা কেন বিশ্বাস করি বা না করি, সেটা যে যার নিজস্ব ইচ্ছে বা অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল৷
কিন্তু, এখানে অবাক করা ব্যাপার হল, সৈয়দ শিষ মহম্মদ স্থানীয় এলাকায় বিরাট করে দুর্গাপূজা করেন হিন্দু-মুসলমান সব ধর্মের মানুষদের নিয়ে৷ যে-উৎসব হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মের উৎসব৷ এজন্য তাঁর নাম ও ছবি জনপ্রিয় নানা সংবাদপত্রে বেরিয়েছে, শান্তির প্রতীক একজন নাগরিক হিসেবে৷
মন থেকে ওঁরা দেশে কিছু সীমিত সংখ্যার পরিবারের মধ্যে পড়েন, যাঁদের কাছে ধর্ম মানে প্রচলিত বিশ্বাসের বাইরে অন্য কিছু৷ এঁরা নিজেদের নিয়মেই বিশ্বনাগরিক৷ এইরকম কারোর কারোর নাম এখানে আনলাম, এমন মানুষও আজকাল আছেন, সেটা দেখানোর জন্য৷
আমি কারোর বিশ্বাস কারোর উপর চাপাতে চাই না, মানুষটিকে নিয়ে প্রসঙ্গক্রমে কিছু বলছি৷ কারণ, আমি পৃথিবীর নাগরিক৷
ওঁনাদের পরিবারের সকলেই কোনো না কোনো শিল্প-সংস্কৃতির সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে আছেন৷ ভারতে ওঁনাদের প্রথম পুরুষ আরব থেকে এসেছিলেন, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময় মুঘল পরিবারের শিক্ষক হিসেবে৷ সম্রাট যখন পরিবারের নানা জনের কূটনৈতিক চালে বিপন্ন হয়েছিলেন, তখন তাঁদের ভয় দেখিয়ে নিজের নিরাপত্তা বাড়াতে আরবের সম্রাটকে কিছু উপদেষ্টা চেয়ে পাঠালেন৷ তাঁদের ভিতর যিনি বহুভাষাবিদ তিনিই কবি শিষ মুহাম্মদের প্রথম ভারতীয় পূর্বপুরুষ৷ এত কথা আমার বলা দরকার ছিল না, এইটাই আমাকে অনেকে বলবেন জানি, কিন্তু এই পরিবারের ধারাই আমার চিন্তাকে দ্রুত বুঝে নিল৷ আর সেটাই স্বাভাবিক৷
এইভাবে অনেকে আছেন, যাঁর আমার এই চিন্তা ও কর্মকে দ্রুত বুঝেছিলেন, এখানে সেই প্রাসঙ্গিকতা আসেনি বলে বলা গেলো না৷ তাই ক্ষমাপ্রার্থী৷
যাইহোক, আমি গেলাম আরো কিছু স্কুলে৷ যেমন---
মেদিনীপুরের জগৎপুর এস-এস-কে স্কুল,
দ্বারিবেড়িয়া আদর্শ শিক্ষাসদন
গেঁওখালি নিকুঞ্জ মেমোরিয়্যাল গার্লস হাইস্কুল
গোপালপুর হাইস্কুল,
গেঁওখালি হাইস্কুল
শিমুলবেড়্যা যোগেস্ত্র বিদ্যাপীঠ
শ্রীকৃষ্ণপুর হাইস্কুল,
নাটশাল হাইস্কুল,
দেউলপোতা হাইস্কুল,
কুম্ভচক পল্লীশ্রী বিদ্যাভবন,
বাবুপুর এগ্রিকালচার্যােল হাইস্কুল,
তেঁতুলবেড়িয়া এস-এস-শিক্ষাসদন স্কুল
সাপুয়া হাইস্কুল,
সুতাহাট লাবণ্যপ্রভা বালিকা বিদ্যালয়,
লক্ষ্যা হাইস্কুল
পরপর আরো অনেক স্কুলে যাব, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব৷ আমি বুঝেছি ছাত্র শিক্ষকগণ সকলেই এই কাজের প্রতি সহানুভূতিশীল৷
আমি দেখালাম, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, ছাত্রছাত্রীদের ভিতর কী বিপুল সাড়া! কোনো কোনো ছাত্রছাত্রী আমার সাথে আলাদা ভাবে কথা বলল৷ একজন ছাত্রী বলে বসল, ‘মাইকেল দা, আমি এই দিবস বাড়িতে পালন করব!’
আমি চমকে গেলাম, যে সব ছেলে মেয়েদের আমরা, অভিভাবকেরা ফাঁকিবাজ, অবাস্তব, ফুট্টানিবাজ ইত্যাদি বলে ধিক্কার দিতে ভালোবাসি, তারাই আসলে সঠিক পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে, আমরা সেটা না বুঝে তাদেরকে ভুল ব্যাখ্যা করে ভুল পথে ঠেলে দিচ্ছি বেশি করে৷ এই সফলতা আমাকে উৎসাহিত করল, আরো আরো শিক্ষালয়গুলিতে যেতে৷ কারণ, আমি বুঝে গেলাম, স্থায়ী বিশ্বশান্তির বীজ লুক্কায়িত আছে ছাত্রছাত্রীদের ভিতর৷
এখন বুঝি তথাকথিত অভিভাবকদের ভাবনা কতটা ভুল৷ আসুন না, সব অভিভাবকগণ, আমরা আমাদের বংশধরদের নিয়ে নতুন ভাবনা ভাবতে বসি৷
একটু আগের বার্তা দিয়েই গ্রন্থটি শেষ করা যাক৷ এতো আলাদা কিছু নয়, বরং অতিরিক্ত অর্থ খরচের থেকে হাজার কোটি গুণ দূরে, কোনো মিথ্যে বলার চাপ নয়, স্বজন পোষণ নয়, যুদ্ধ-দ্বন্দ্ব নয়, শুধু স্বাভাবিক হয়ে থাকবার প্রণালী৷
আর সেজন্য চাই, ওদেরকে বিশ্ব ভাবনায় প্রবেশ করানো, যা ওরা চাইছে আত্মা থেকে৷ তাহলেই তো সব দুরারোগ্য অসুখগুলো ছেড়ে চলে যাবে পৃথিবী থেকে!
কারণ, ছাত্রছাত্রীরাই কারোর থেকে না শিখে বলতে চায়, বা ভাবতে পারে, বলতে পারে---
‘উই আর দ্য সিটিজেনস অব দি আর্থ’