এত কিছুর পর, আমরা একটা স্বস্তির শ্বাস পেলাম৷ কারণ আমাদের এইভাবে এতদূর চলে আসাটা কতখানি শ্রম ও বিপন্নতার ভিতর দিয়ে আসা, সেটার স্মৃতিচারণ করতেই হয়৷ এদিকে আমার কাছে, কলকাতার ফ্ল্যাটে আসতে শুরু করলেন তাঁরাই, যেসব শিল্পীদের পাওনা গন্ডা কিছু বাকি৷ যে ভাবে হোক, আমাকে এগুলি ক্লিয়ার করতে হবে৷ আমি আবার একরকম বিপন্নতার ভিতর ঢুকলাম৷ আসলে অনুষ্ঠানের যে সুস্থিরতা ছিল, সেটা সাময়িক, কিন্তু, তারপর এই সব ঝামেলা আসবে, এই অনুভব আমাকে নাড়া দিয়েছিল ঠিক-ই, কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে একটা তৃপ্তি পেয়েছিলাম, এই কারণে যে, এবার আমরা প্রস্তুতি নেব, রাষ্ট্রসংঘে প্রপোজাল রিকোয়েস্ট পাঠাতে৷ এইটাই আমার কাছে অনেক দুঃখ ভোলার কারণ৷ এই সময় একটা কথা বলে রাখি, আমি অনেকদিন ধরে খুঁজছিলাম, একজন ইংরেজি অনুবাদক৷ কারণ, অনুবাদ কর্মে ঋদেনদিক এইভাবে নামতে নারাজ৷ কারণ, তাহলে তাঁর মৌলিক ভাবে ইংরেজি ও বাংলা লেখা নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি হবে ও নানা ভাবে কোনো অগোছালো ব্যাপার আসতে পারে৷ চিঠিপত্র ঠিক আছে, কিন্তু কবিতা, সংগীত ইত্যাদি অনুবাদ নিয়ে তাঁর মতামত ভিন্ন।
এই কথাগুলি বলতে হচ্ছে, কারণ, একটি বিরাট কর্মের প্রক্রিয়া কীভাবে শুরু হয়, চলতে থাকে, ও নানা ভাবে নানা পরিস্থিতির ভিতর কী ভাবে পড়ে সেগুলি না বললে কোনো চিন্তা-কর্ম প্রকরণের স্তরগুলিকে অনুভব করা যায় না৷
যাইহোক, আমি ব্যাপারটা বুঝলাম, কারণ যে যার মতো করে নিজের প্রতিষ্ঠা নিয়ে নিজেদের কঠিন অঙ্কে চলেছে৷ এটা খুবই ভালো৷ আমিও ওনার ওপর আস্থা পেলাম আরো বেশি করে, কারণ, উনি কেউ কোনো সুযোগ দিলেই লোভে পড়ে লুফে নেন না৷
কিন্তু, আমার অসুবিধা হল৷ আমাদের যে সব কাজ, কবিতা-সংগীত ইত্যাদির অনুবাদের ক্ষেত্রে। বিশেষত বাংলা থেকে ইংরেজি৷ এখন-ই দরকার কাউকে৷
এই ভাবনায় আমি যখন চিন্তিত, তখন ঘটনাক্রমে একটি সাহিত্যের অনুষ্ঠানে পরিচিত হই ইংরেজি ভাষার আর এক কবি, ঋতুপর্ণা রায়চৌধুরির সঙ্গে৷ প্রাণোদীপ্তা দুরন্ত ইংরেজি কবিতা পড়ে সভা মুগ্ধ করলেন৷
আমার যে-টুকু জ্ঞান, তাতে অনেক কিছু অনুভব করলাম ঋতুপর্ণাকে নিয়ে, মানে ওঁকে নিয়ে আমার প্রতিষ্ঠানের কবিতা-সংগীত অনুবাদের কাজ চলার সম্ভাবনা৷ অনেকগুলি বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারেন উনি৷ ফাংশানে গান গেয়ে থাকেন, মানে এক কথায় গায়িকা৷ একজনের কত গুণ!
এদিকে আমাকে ঋদেনদিক একটা কথা বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক চিন্তা-রুচি-স্বভাব ইত্যাদি না থাকলে কেবল কাজের যোগ্যতা দেখে কাউকে দিয়ে বৃহৎ স্তরে কিছু করতে চাইলে বিপন্নতা আসে৷
আমি ঋদেনদিকের কথা নিয়ে ভাবতাম, এই কারণেই যে, যে-কথাটা সম্ভবত আগে বলা হয়নি, সেটা হল, ঋদেনদিক আমার এই ফাউন্ডেশনের অ্যাডভাইজর-ইন-চার্জ৷ উনি স্থায়ী ভাবে থাকতে চান নি এই কারণে যে, তাতে ওনার স্বাধীন কথা বলা পথ বন্ধ হবে ফাউন্ডেশনের আইনের বাঁধনে, তাই তিনি অস্থায়ী ইন-চার্জ হিসেবে যুক্ত হলেন৷
উনি কোনো পদ বা উচ্চ বেতনের বিনিময়ের নিজের স্বাধীন স্বাভাবিক প্রবণতাকে বিক্রি বা বিকৃত করে জীবনকে রসহীন বা বন্দী করতে নারাজ৷ ওঁনার এই ভাবনা আমার ভালো লাগলো এই কারণে যে, এই জাতীয় নির্লোভ মানুষদের আমার প্রয়োজন৷ সর্বপরি উনি আমাকে বারবার বলতেন, অনেকের অনেক গুণ আছে, দেখে শুনে বেছে খুঁছে কাজে লাগালে কাজের বৈচিত্র্য ও উত্তোরণ অনেক ভালো হবে৷ যদিও সেই ভাবে খুঁজে নেওয়াও খুব কঠিন কাজ৷ কারণ অনেকের প্রতিভা ভালো হলেও, স্বভাব খুব বিক্ষিপ্ত ও নানা রকম নেগেটিভিটিতে ভরা৷ পরে সেগুলি প্রকাশ পেলে পরিস্থিতি সত্যি বিপন্ন ও ভালো সফলতার সম্ভাবনা হাত ছাড়া হয়৷
এই কথাগুলি কোনো বাড়াবাড়ি নয়, অতিরিক্তও নয়, সিকোয়েন্স অনুযায়ী চলে আসছে, কারণ, তা না হলে গ্রন্থটি নিরস ও প্রকৃত তথ্যহীন হবে৷ এই বই-এর গ্রন্থ মর্যাদা বলে তখন কিছুই থাকবে না৷
এরপর, আমি আমার কাজের কথা ঋতুপর্ণাকে জানালাম৷ উনি রাজি হলেন, আর আমি ঋতুপর্ণাকে পরে একসময় দিলাম এইগুলি, যেমন কবি তপন কুমার মাইতির দীর্ঘ কবিতা ‘পৃথিবীর জন্মদিনে’ ও দুটি সংগীত---‘পৃথিবী ও পৃথিবী তুমি নাও গো আমার প্রণাম’ ও ‘সুস্বাগতম অভিনন্দন পৃথিবী তোমায়’ সহ লোকগীতি৷ শিল্পী গৌতম দের লেখা লোকগীতি ---‘এ পৃথিবী ও পৃথিবী’, আর তারপর উনি ওনার অনুবাদ পাঠালেন আমাকে৷ সাহিত্যের গভীরতা আমি ব্যাকরণ সম্মত ভাবে বুঝিনা৷ আমার ফাউন্ডেশনের অ্যাডভাইজর-ইন-চার্জ লেখক ঋদেনদিক অফিসের নিয়ম অনুযায়ী দেখালাম। উনি বললেন,আন্তর্জাতিক মানের অনুবাদ, কল্পনার বাইরে! অনুবাদের এতো দক্ষ হাত আমারও নেই! কী করে পেলেন আপনি!’
আমি ছোট করে বললাম, ‘বিশ্বমাতার হাত৷ তাঁর দরকারে তিনি তাঁর যে-কাজে যাকে দরকার তাকে আনিয়ে নিয়ে কাজ করে নিচ্ছেন!’
আসলে আমি কোনো মহাপুরুষ নই, আপনাদের মতো পাঁচ রকম দোষে গুণে আমি একটা মানুষ৷ কিন্তু, বিশ্বমাতার জন্য কাজে নেমে পরপর আমার ভিতর খুব ধীরে ধীরে হলেও একটা পরিবর্তন আসছে, এটা বুঝতে পারি৷ আর তখন-ই বুঝতে পারছি এইভাবে অন্যরাও পরপর বদলে যাবে৷ বোধ হয়, নিজেকে দিয়েই এই পরীক্ষাটা করে আমার কাজের বাস্তবতা বুঝতে পারলাম৷
যদিও একজন সঠিক মানুষ হতে অনেক সময় যায় অনেকের ক্ষেত্রে৷ আমার ক্ষেত্রে কত সময় যাবে জানি না, এটা এই কারণেই বলছি যে, বিশ্বমাতার ওপর কাজ করতে গিয়ে নিজের ভেতরটা এভাবে না দেখতে চাইলে, নিজের মনটাও শান্ত হয় না৷
আমি তৃপ্ত হলাম এই কারণে যে, আমি কী এক অব্যক্ত ধারায় যেন পরপর যাঁদেরকে পেয়ে যাচ্ছি, তাঁরা আমার চিন্তা ও কর্মের সঠিক বোদ্ধা শুধু নয়, তাঁরা উপযুক্ত সহযোগীও বটে৷
সেই তালিকায় এলেন আবার ঋতুপর্ণার মতো প্রাণোদীপ্তা একজন৷