দুই

সকলের কাছে ক্ষমা চেয়ে আগেই বলে রাখি৷ একটি কর্ম সফলতা পায়, অনেকের সহযোগিতায়৷ কিন্তু এ গ্রন্থ লিখতে গিয়ে দৃশ্যের প্রাসঙ্গিকতায় যাদের নাম ও বিষয় যতটা আছে ততটাই বলতে হবে আমাকে৷ যাঁদের এখানে নাম থাকলো না বা যাঁদের নাম ও আলোচনা অল্পের মধ্যে সারা হয়েছে, সেটা এখানের প্রয়োজনে, কিন্তু অন্য স্থানে আবার তাঁদের নিয়ে প্রকাশ অনেক ভালো করে করা হয়েছে৷
সেখানে হয়তো, এখানে এখন যাঁরা একটু বেশি করে আলোচিত হবেন তাঁরা অনেক কম আলোচিত হবেন বা দৃশ্য হবেন৷ তাই আমরা সকলেই পৃথিবীকে ভালবেসে কাজ করছি, কোনো ভাবে ভুল বোঝাবুঝি করে নিজেকে দুর্বল করব না এটাই অনুরোধ৷
আর কাহিনির প্রয়োজনে অনেক কথাই আসবে, সেগুলি সব-ই এই সময় ও কারণের সাথে অনিবার্য৷ সেই ভাবেই সকলে নেবেন৷
এবার ফিরে আসি শুরুর ঘটনার পরের বিবরণীতে৷
আমার এখন বাড়ি ফেরার পালা৷ আমার জন্মভিটে নাটশাল৷ হঠাৎ যেটা বলব বলছিলাম, কেন আমি ফ্লাইটে এতখানি কনফিডেন্ট ছিলাম যে ফ্লাইট ক্র্যাস করলেও আমি বেঁচে যাব৷ কারণ সৃষ্টিকর্তা হয়তো আমাকে উদ্দেশ্য নিয়ে পাঠিয়েছেন৷ এক মহান উদ্দেশ্য! যে কাজটা আমি এখনো সম্পূর্ণ করতে পারিনি৷ আর আমি এটুকু জানি, তিনি যে উদ্দেশ্যে আমাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, সে উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ না করা পর্যন্ত তিনি আমাকে পৃথিবী থেকে তাঁর কাছে ডেকে নেবেন না৷ আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ৷ তিনি তাঁর এই মহান কার্যভারটা আমার ওপর সঁপেছেন৷ তিনি আমার সামনে এসে কিন্তু এই কাজের দ্বায়িত্বটা আমাকে অর্পণ করে যান নি৷ তিনি তাঁর চিরাচরিত পদ্ধতিতেই হয়তো আমাকে ইঙ্গিত দিয়েছেন --- তিনি আমাকে এই দ্বায়িত্ব দিয়ে হয়তো এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন৷
সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বর নিয়ে ভাবনাগুলি আমার মতো অন্য কেউ নাও ভাবতে পারেন, কিন্তু এগুলি আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি, এইটুকুই বলতে পারি৷
সালটা ছিল ২০০৯, আমি আমার মামার বাড়ি গিয়েছিলাম । মামার ছেলে ছবি আঁকে৷ সে বেশ কিছু ছবি আমাকে দেখিয়েছিল৷ আমি কোনোদিন-ই পেইন্টিং নিয়ে উৎসাহী ছিলাম না৷

পৃথিবীর অনেক - অনেক সুন্দর জায়গাগুলোতে আমি ঘুরে দেখেছি৷ বহু নারী-পুরুষ-শিশুর সাথে পরিচিত হয়েছি, কিন্তু পৃথিবীর ভেতর এতো সৌন্দর্য---আর তা একটি ছবিতে, যা আমাকে মুগ্ধ করল, তাহলে সমগ্র পৃথিবীর কত সৌন্দর্য, যা আমরা সচেতন ভাবে ভাবিনা! আরো একটা জিনিস মাথায় ঢুকল, সেটা হোলো---এটা তো সুন্দর, কিন্তু এর মাঝে প্রাণ নেই, তাহলে পৃথিবী মাতার ওপরে তাঁর যে জীবন্ত সৃষ্টিগুলি---জীব ও জড়---দুই রূপে বিরাজিত---তার সৌন্দর্য আরো কত গভীর ও মনোমুগ্ধকর!
এবার আমার মাথায় ভাবনা এলো যে, এই যে এত সৃষ্টির ব্যাপকতা, এর কারণ কী! এর কারণ হল, পৃথিবীমাতা চাইছেন, সব জীব সুন্দর থাক৷ মানুষ সব কিছু উপভোগ করবে, এটা তার জন্মগত অধিকার৷
এর মানে আমি এটা বলছি না যে, মানুষ মানে কেবল ভোগবিলাসের জন্য একটি জন্ম, আমি বলতে চেয়েছি যে মানুষ কেউ কাউকে ফাঁকি না দিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই সকলে স্বচ্ছল ভাবে বাঁচতে পারে৷ আর সেই সঠিক ভাবে বাঁচবার পদ্ধতিতে ভুল আছে বলেই একটা সংখ্যক মানুষকে তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে বাঁচতে হয়৷
আমরা এই উপভোগ করার জন্য একটা শ্রেণি নানা নিয়মে প্রতারণার পথ নিয়ে থাকি, আর একটা দল নিজের স্বাভাবিক ইচ্ছের ওপর চাবুক মেরে কোনোভাবে বাঁচবার জন্য নামমাত্র জিনিস বা দ্রব্য নিয়ে টিকে থাকি৷
এখানে, প্রথম পক্ষকে বলি অপরাধী, দ্বিতীয় পক্ষকে বলি অতি মহান৷
কিন্তু আমার কথা হল, দুটোর কোনোটাই তো আমাদের দরকার নেই৷
আমাদের দরকার পৃথিবীকে সঠিকভাবে সকলে উপভোগ করা৷ আর, যখনি আমরা ভাববো যে পৃথিবীটা আমাদের দেশ, তখন খুব সহজেই সব সমস্যার সুরাহা হবে৷
এই কথার পরে অন্য অধ্যায়গুলিতে ধাপে ধাপে আসছি৷ এখানে যে-টুকু বলা দরকার, সে-টুকু বলে ফেলি৷
সারা পৃথিবীতে মূলত দুরকম রাজনৈতিক দল আছে৷ এক পক্ষ হোলো--- দক্ষিণপন্থী, এই দক্ষিণপন্থীরা বিবিধভাবে বিবিধনামে পরিচিত, আর অপরপক্ষ সাম্যবাদী বা কমিউনিষ্ট নামে পরিচিত৷ দক্ষিণপন্থীরা বলেন যে, মানুষ তার মেধা অনুযায়ী সম্মান ও অর্থ কামাবে৷ কমিউনিজম বলছে, সকলের সমান অধিকার৷ তাই যাদের আছে অনেক, তাদের থেকে কেড়ে নিলেই সমস্যার সমাধান৷ এর সাথে আরো নানা রকমের পদ্ধতি আছে কমিউনিজমের, যেগুলি সব মিলিয়ে দিলে বোঝায়, শ্রেণিসংগ্রাম৷
মানে, সমাজে চিরকাল লড়াই চলবে, যে রাজনৈতিক দল যখন আসবে সে কেড়ে নেবে বিপরীত পক্ষের কাছ থেকে৷ এইভাবে চলবে ও চলছে প্রতিনিয়ত নানা ভাবে হিংস্রতা, ব্যক্তি-ব্যক্তি, গোষ্ঠী-গোষ্ঠী, দেশের সাথে দেশের৷ এর ফলাফল নানা রকমের আগ্রাসন৷ তাহলে কোনো রাজনৈতিক দল কী ভাবে শান্তি আনতে পারে!
এই প্রশ্নটা নিয়ে সকলে এখন ভাবুন, আর ভাবতে ভাবতে আরো এগিয়ে যাই চলুন৷
যাইহোক, এবার সেই ছবিটার কথায় আসি৷
ওর সৌন্দর্য আমাকে ভীষণভাবে ভাবাচ্ছিল৷ ছবিটা ছিল ২২×৩০ ইঞ্চি পেপার ওয়ার্ক৷ আঁকা ছবিটা পৃথিবীর একটা ছোট্ট টুকরোর নকল কপি মাত্র৷
এই ছবিটা কী করে আমার জীবনের চিন্তাধারা ও রুচি বদলে দিল, একটু খুলে বলি৷
আমি ঐ ছবির প্রতি আলাদা কোনো দরদ দেখাইনি৷ কারণ, আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের মানুষ বলা যেতে পারে, যার সাথে শিল্প সাহিত্যের কোনো যোগাযোগ নেই৷ কিন্তু, একজন উপহার দিলে সেটা আমরা ফেলে দিতে পারি না৷ যদি ক্ষতিকারক কোনো দ্রব্য হয় সেটা আলাদা৷ যেটা শিল্প সেটাতো ক্ষতিকারক নয়৷ আমার অনুভূতির বিষয় নয়, তাই সেটা নিয়ে আমার কোনো আবেগ নেই৷ তবু, উপহারের সম্মানে আমি ওটাকে নিয়ে এসে কলকাতায় একটি ছবি বাঁধাই দোকানে বাঁধাতে দিলাম৷
এরপর একদিন ঐ ছবিটা আনতে যাই, না, কোনো আলাদা অনুভূতি নেই,  কেবল একটা কাজ হিসাবে করতে যাচ্ছি৷ কিন্তু, সেখানে গিয়ে যখন দোকানদার-এর থেকে ছবিটা হাতে নিলাম, আমি দেখে চমকে গেলাম, এই ছবি কি সেই ছবি, যেটা উপহার হিসেবে পেয়েছিলাম! বাঁধাই ছবিটার রূপ দেখে চমকে গেলাম৷ কারণ, আমি এইবার ছবিটার অনেক গভীরে ঢুকে যেতে থাকি পরপর৷ ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকেছি অনেকক্ষণ৷
এবার বলি মোদ্দা কথা, আগে ভাবতাম, পাগলেরা কোটি কোটি টাকা দিয়ে ছবি কেনে, কী বা মূল্য ওর৷ একটু রং, তুলি আর একটা কাগজ বা কাপড় বা বোর্ড, এইতো! এর এত দাম হয় কী করে!
কিন্তু এবার আমি বুজলাম, না, কারণ আছে৷ পেইন্টিংস এর কেন কোটি কোটি টাকা দাম হয়, কেন একটা ছবি নিয়ে গবেষণা হয়, তার কারণ আছে৷ আমি বারবার ভেবে লজ্জিত হতে থাকলাম যে, আমিই পাগল ছিলাম হয়তো, মানে অজ্ঞতার পাগলামি, তাতেই বুঁদ হয়েছিলাম৷
এদিকে, আমি ক্রমশ এই ছবিকে কেন্দ্র করেই নিজের ভিতরে অনেক গভীর চিন্তাধারায় প্রবেশ করলাম পরপর৷ হয়তো খুব ধীরে ধীরে, কিন্তু এইভাবেই আমার ভিতরে বিশেষ ধরণের রুচিশীল ভাবনার প্রবণতা তৈরি হতে শুরু করল৷

এবার ছবির দিকে আসি৷
এরকম সৌন্দর্য পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে৷ যা একজন শিল্পীর চোখে ধরা পড়েছে৷ তাহলে শিল্পীরা পৃথিবীকে একটা সাধারণ মানুষের চেয়ে কতটা বেশি উপভোগ করতে পারে৷ যদি প্রত্যেক মানুষ শিল্পীর শিল্পীয় চোখ দিয়ে পৃথিবীটাকে দেখতো---তাহলে আরো কত বেশি উপভোগ করতে পারতো তার সৌন্দর্য৷
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এই ছবিগুলোকে একজিবিশনে নিয়ে যাব, এবং শিল্পীদেরকে সাহায্য করব৷ যাতে করে তাদের শিল্প, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়া যেতে পারে৷ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পৃথিবীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিটা নতুন ভাবে সঞ্চালন করা যেতে পারে৷
এদিকে কলকাতা, ICCR-এ ২০১৪ তে ডিসেম্বর মাসে একটি একজিবিশন করলাম৷ এরপর এই একজিবিশনে সাধারণ মানুষের থেকে ভীষণ সাড়া পেলাম৷ ধীরে ধীরে সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বরের ঈঙ্গিত আমার কাছে পরিষ্কার হতে শুরু করলো৷ তিনি আমাকে কোন কারণে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন৷
এই যে বললাম, ঈশ্বর উপলব্ধি, এটা আমার নিজের মতো অনুভূতি, এটার সথে আমি তো কাউকে কিছু চাপিয়ে দিতে চাই না৷ কিন্তু এই অনুভূতিগুলি যে যার নিজের মতো নিয়ে চলি৷ এইটুকু বলতে পারি৷ আসলে কেউ না কেউ তো যে কোনো রূপেই হোক স্রষ্টা৷ তাঁদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ৷ এই অনুভবটা একান্ত নিজের৷
এই একজিবিশনে শুধু যে মানুষ দেখতে আসছেন তা নয়---এখানে সাংবাদিকগণ এসেছিলেন নানা মাধ্যম থেকে৷ তাঁরা আমার এই উদ্দেশ্যটাকে বাহবা দেন৷ আর তাঁদের এই বাহবা আমার এই আত্মবিশ্বাসকে আরো বাড়িয়ে দিল৷
এখানে একটা ছবি বিক্রি হয়েছিল মাত্র৷ সেটাই যথেষ্ট ছিল এই কারণে যে নতুন শিল্পীদের দিয়ে কাজ করতে নেমে জনগণ ও বোদ্ধাদের তথা সাংবাদিকদের থেকে এতটা আগ্রহ পাব---যেটা আমার কাছে আশাতীত ব্যাপার ছিল৷ ছবিটা ছিল কে. নারায়ণের ছবি৷ আর অন্যদিকে ফারনানডো রডরিক ওরফে অভিজিৎ-এর ছবি ছিল, যা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে৷
ছবি ছিল প্রায় চল্লিশটি৷ হ্যাঁ, এখানে একটি বিশেষ তথ্য দেওয়া দরকার৷ একজিবিশনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আসেন ডঃ অরূপ মিত্র-বিখ্যাত আধ্যাত্ববাদী গবেষক, যোগগুরু গৌরী শঙ্কর দাশ, চিত্র পরিচালক আশীষ বসাক, অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তী প্রমুখ৷
এতদিনে আমি ঈশ্বরের নির্দেশ পরিষ্কার বুঝতে পারলাম৷ উনি ওনার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এই সুন্দর পৃথিবীকে নতুন ভাবে ভাবাতে হয়তো পাঠিয়েছেন, কোনো না কোনো ভাবে৷
এরপর আবার একটি একজিবিশন করলাম কলকাতার কেমোল্ড আর্ট গ্যালারিতে, সময়টা মার্চ ২০১৫৷ এখানে ছবি ছিল কে নারায়ণ-এর ৮টি, ফারনানডো রডরিক এর ৪টি, দীপঙ্কর এর ৬টি৷ এই খবরগুলি টাইমস অব ইন্ডিয়া সহ কয়েকটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের কয়েকটি টিভি চ্যানেল যেমন ওঁকার টিভি, এ-টি-এন বাংলা, একাত্তর টিভি প্রভৃতিতে দেখানো হয়েছিল৷
এরপর মে মাস এল, ২০১৫, গেলাম আবার অষ্ট্রেলিয়ায়৷ কারণ পেটের টান৷ আসলে যা আয় তা ব্যয় হয়ে যেত৷ কখনো তো ভাবিনি একটা সময় শিল্প নিয়ে এই সব কাজ করব মানবিক কল্যাণে৷ তাই আলাদা করে কোনো সঞ্চয়ের কথা ভাবতাম না বলে ব্যক্তি জীবনে খরচে কার্পণ্য করতাম না৷
যাইহোক আমাকে আবার চলে যেতে হল অষ্ট্রেলিয়া৷ ভারতবর্ষ ছেড়ে৷ কখনো মনে হয়েছে ঈশ্বর বা কোনো অজানা শক্তি আমাকে দিয়ে অনেক কাজ করাতে চান, আবার মনে হয়, কী যে করতে চাই কিছুই বুঝি না৷ এভাবেই চলছি, আবার ওই ভাবনার ফলাফল কী হবে কে জানে!
তাহলে এখন আমার এত ভাববারও সময় নেই৷ পকেটে টান মানে পেটে টান, চললাম অস্ট্রেলিয়ায়৷
আবার গেলাম৷ আমার প্রিয় দেশ, অষ্ট্রেলিয়ায়৷ আসলে ওখানে থেকেছি বছরের পর বছর৷ ওর মাটির সাথে, মানুষের সাথে মিশে গেছি৷ দেশটাকে বেশ ভালো লাগে৷ ওর মাটি প্রকৃতি আমাকে টানে৷ এদেশে এসে, মানে ভারতবর্ষে, এখানে এসে মাঝে মাঝে মনে পড়ত অস্ট্রেলিয়াকে৷ স্মৃতিগুলো মনে করতাম৷
আর, সেই স্মৃতিতেই ফিরে যাচ্ছি আবার!
ওখানে তো আবার ফিরে গেলাম! ভারতে আমি এর মধ্যে একটা গণ্যমান্যদের তালিকায় ঢুকে পড়েছি৷ না চেয়েও৷ কারণ ভাল কাজ করলে মানুষ স্বাভাবিক কারণেই ভাল সম্মানের ভাগী হয়৷ ওখানে ভাবতে থাকতাম৷ কত সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেল আমাকে নিয়ে খবর করেছে, কী করে আমি তরুণ শিল্পীদেরকে তুলে ধরেছি৷ তাদের প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু আমার সামান্য সামর্থের আয় দিয়ে এই কাজ করছি৷ আসলে এই ভাবে যতটুকু সম্ভব মানুষকে শিল্পের দিকে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা৷ আসলে বলা ভালো, আমি এই কাজ করে ভিতরে একরকম আলোকিত হচ্ছি৷
যা বলছিলাম, অষ্ট্রেলিয়াতে এলাম, কিন্তু সাথে সাথে কাজ পেলাম না৷ টিকে থাকব কী করে! নিজেকে খুব বিপন্ন মনে হত! আসলে দোষটি আমার! আমি-ই তো চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম৷
কিন্তু আমারও কিছু করার নেই৷ বড় কাজ কর৷ মনে তো ভয় বা সংশয় থাকলে হবে না৷ কিন্তু সাহস তো দেখিয়ে ছিলাম৷ চাকরি ছাড়লাম, এখন খাব কী৷
এই অসহায়তায় থেকে আমি সিডনির মেরিকভিল-এর বাসায় ব্যালকনি থেকে তাকিয়ে দেখছিলাম, বাইরের দিকে আনমনা হয়ে৷ অনেক দূর অব্দি চোখ চলে গেল৷ মনের মধ্যে বেকারত্বের জ্বালা, কারণ এখন আমার কাজ নেই, সত্য-ই তো আমি বেকার৷
সেই জ্বালাকে ছাপিয়ে আমি স্বপ্নের জানালা দিয়ে দেখা বাইরের পৃথিবীটা কী ভালো যে লাগলো৷ কিছুক্ষণের জন্য মন খারাপটা হঠাৎ পালটে মন ভালো হয়ে গেল৷ সত্যি বলছি৷
পকেট শূন্যতার জ্বালাটা আমি যখন সইতে অপরাগ, তখন এই ব্যালকনিতে বসে পৃথিবীকে দেখার আনন্দ আমাকে হঠাৎ করে একটি ভাবনা উপহার দিল৷ এই পৃথিবীটা এমন কেন৷ এত সুন্দর দেশ, এত সুন্দর বিশালতা৷ তাহলে কী এমন ব্যাপার আছে যে জন্য এই সুন্দর পৃথিবীতে এত দুর্ভোগ৷ কারো কাজ আছে, কারো কাজ নেই৷ কেউ অনেক অর্থ পায়, কেউ সামান্য পায়, কেউ পায় না৷ সেই সাথে বিপন্নতা৷

মনে হল জানালার পাশে নতুন এক জানালা পেলাম৷ বিশ্বকে শান্তি দেবার জানালা৷
তখনি মাথাতে এল এমন একটি দিবস পালন করতে হবে যেটার মাধ্যমে সারা পৃথিবীর জাতি,ধর্ম, বয়স সব এক হয়ে যাবে৷
মনে মনে আমি স্বপ্নটাকে জমিয়ে রাখলাম সিন্দুকের ভিতর, কোনো দুর্লভ রত্ন রাখবার মতো৷ তারপর একটা সময় কাজ পেলাম৷ সাময়িক তৈরি হওয়া বেকারত্বটা ঘুচল আমার৷ এবার ওই টাকাতে আমার চিন্তাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নানা ভাবে তৈরি হতে শুরু করলাম৷ বলতে বলতে হঠাৎ মাথায় এল Birthday Celebration of our Beautiful Mother Earth on the ‘Earth and Art Revolution Day.’

আমি একটা জিনিস ভেবেছিলাম, গ্যাসিয় পিণ্ডটা তো পৃথিবী নয়, মানে আমি বলছি পৃথিবীর সৃষ্টিটা কীভাবে হিসেব করব?
আসলে যে-সময় থেকে পৃথিবী তার সৃষ্টি ক্ষমতায় বদ্ধপরিকর, সে সময় থেকে তার সম্মান পাবার অধিকার রয়েছে৷
তাই নাম দিলাম ‘আর্থ এন্ড আর্ট রিভলিউশন ডে’৷ বাংলায় হয় ‘পৃথিবী ও কলা বিপ্লব দিবস’৷ তারিখ ঠিক করলাম আর কী৷
আপনি বলবেন, ১৫ই জানুয়ারি কেন৷ কারণ, পৃথিবীর সৃষ্টির সময় তো কোনো মাস-সাল ছিল না৷ তবে আমি বলছি যে, যে দিন-ই আমরা পালন করতে চাই না কেন তা খৃষ্টাব্দ, মাস ও তারিখের মধ্যে থাকতে হবে৷
অন্যান্য ক্যালেন্ডারের দিনগুলি-ও তাই, যে দিনই ধরো প্রত্যেক ক্যালেন্ডারের কোন না কোন একটা দিন-ই তো হবেই৷
আসলে কোনো এক সময় তো পৃথিবী তৈরি, মানে তার গ্যাসিয় অবস্থান-ই বলো, শীতল অবস্থান-ই বলো, একটা তো সময় তা হয়েছিল যেহেতু সময় ছাড়া কাজ হয় না৷
তাই এই দিন মানে ১৫ই জানুয়ারি ঠিক করলাম৷ ১৫ তারিখটা কেন মাথায় এলো সেটাই আমার অজানা, যদিও ঘটনাক্রমে একটা সুখবর হল, এই দিনে কোনো দিবস রাষ্ট্রসংঘে নেই৷ থাকলেও কিছু করার ছিল না, কারণ অনেক দিবসের চাপ থাকলে, এক দিনেও দুটি দিবস থাকতে পারে, আসলে মানুষ তার মতো করে সব ঠিক করে নেবে, এটাই আসল কথা৷
বলতে বলতে চলে এল মে থেকে পরবর্তী বছরের অক্টোবর পর্যন্ত, মানে ২০১৬ পর্যন্ত৷ আমি এখানে ৩১ অক্টোবর একটা প্রমোশন্যাল প্রোগ্রাম করব বলে স্থির করলাম৷ জানি এই ক’মাসে যেটুকু টাকা অতি কষ্টে সঞ্চয় করেছি, সবই এইভাবে খরচ হবে প্রায়৷
একটা ভাল হল ভাড়া নিতে হবে৷ কারণ পৃথিবীর জন্মদিন পালনের জন্য এটা প্রাথমিক শর্ত-ই বলা উচিত৷
যে দেশকে এত ভালোবাসি, যে দেশ থেকে আমি রুজি-রোজগার করি, সে দেশে আমার জীবনের সেরা স্বপ্ন ও কর্মের প্রথম স্পর্শ দিলে আমার জীবন ধন্য হবে৷
ঠিক তাই হল, ৩১ অক্টোবর সিডনিতে করলাম ওই নিয়ে প্রমোশন্যাল৷
আর তার আগে বিভিন্ন দেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতিদের পত্রে আমন্ত্রণ পত্র দিই৷
ভাবতে রোমাঞ্চ লাগল, যখন আমার এই চিন্তা ও কর্মের প্রতি সমর্থন পেলাম---অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীদের কাছ থেকে৷
মঞ্চ ভাড়া নিলাম৷ রাজকীয় মর্যাদায় মঞ্চ সাজানো হল৷ জনগণের আসন থেকে জিনিসপত্র সবই রাজকীয়৷
ওখানে একটা জিনিস করলাম৷ ঐ অনুষ্ঠানেও একজিবিশন করলাম৷
কারণ, আমি বোঝাতে চাইলাম, আজও চাই যেটা বোঝাতে, সেটা হল শিল্প-চেতনা চাড়া জীবনের পূর্ণতা নেই৷ তাই আমি ওই পথই নিলাম৷
ওই একজিবিশনে ছিল কলম্বিয়া, নিউজিল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়া ও ভারতের কয়েকজন শিল্পীর আঁকা ছবি৷
মনে পড়ছে, আমি যখন আমার শুভদা, ওরফে সুকান্তরঞ্জন পালকে পত্রটা দিতে যাই, তখন হঠাৎ তিনি বলেন, ‘মাইকেলদা, আমি তোমার থেকে এই কার্ডটা এমনি নেব না৷ তুমি জান না, তুমি একদিন কোথায় পৌঁছাবে৷ এই নিমন্ত্রণ পত্রটা তুমি স্বাক্ষর করে আমাকে দিও৷’
কী এক সুদূর দৃষ্টিশক্তি ওঁর চোখের মধ্যে দেখেছিলাম সে দিন বোঝাতে পারবো না৷ ওঁর চোখের ভাষা ছিল যেন সত্যি অন্যরকম৷ কী যেন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন তিনি আমার দিকে চেয়ে৷
যাক, এভাবে আগে পিছে অনেক কথা বলে গেলাম, অষ্ট্রেলিয়ায় প্রমোশন্যাল প্রোগ্রামের কথা৷ মনে মনে ভাবতে থাকলাম, আমাকে আবার চাকরি ছাড়তে হবে৷ আমার কাজ আমাকে করতে হবে৷
চাকরি তো ছাড়ব ঠিকই, কিন্তু আবার যদি পকেটে টান আসে৷ আর সেটাই আসার সম্ভবনা বেশি৷ জমা অর্থ খরচ করলে পকেট শূন্য তো হবেই৷ তবু করতে হবে, কারণ, যেকারণে প্রমোশন্যাল প্রোগ্রামটা করেছি, আর তার পরের কাহিনিগুলোও আমাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে৷
নিজেকে কৃপণ বানিয়ে বাকি ক’মাস অবধি পয়সা জমালাম৷
বিদেশে খরচ সামলে আমাদের মতো ছাপোষা মানুষের কী বা হবে৷ কীভাবে আমার মতো ছাপোষা মানুষেরা বাঁচে সেটা আমার মতো মানুষেরা জানে৷ যাক, বলতে বলতে চলে এল ডিসেম্বর৷
এলাম ভারতে৷ কোনো দেরি নয়, প্রেস ক্লাব কলকাতায় গিয়ে তারিখ ও সময় ঠিক করি, তারপর ব্যবস্থা নিই, প্রোগ্রামের জন্য৷
আমন্ত্রণ করা হল বিখ্যাত পরিবেশবিদ সুভাষ দত্তকে, যিনি পার্কস্ট্রিটের কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তক মেলাকে সল্টলেকে পাঠিয়ে ছিলেন পরিবেশ দূষণের যুক্তি দিয়ে, আইনের কাছে বছরের পর বছর লড়ে৷
ওই মঞ্চে ছিলেন আরো গুণীবর্গ৷ দিনটি ছিল ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৬৷
আসলে ওই প্রেস মিট‍্টাকে যদি বলেন ইন্ডিয়ার প্রমোশন্যাল, তাহলে বলব---বলতে হয়তো পারেন, কিন্তু কথাটা হল, এটা তো প্রেস মিট‍্৷ আমার ভাবনা ও থিয়োরি নিয়ে সাংবাদিক বন্ধুদের বোঝাবো কী করে৷
এখানে এসেছিল উর্দু, বাংলা, ইংরেজি, হিন্দির মুদ্রণ ও বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমগুলি৷
তাদের গুরুত্ব পাওয়াতে আমি বুঝলাম---আমি যা ভাবছি তা সত্যি মহৎ কোনো কাজ, তাই নির্দ্বিধায় এত সংবাদ মাধ্যম এলেন৷
এভাবে হয়ে গেল আপাতত ২০১৭ সালের জন্য আগাম প্রস্তুতি,
এল ২০১৭ সালের ১৫ই জানুয়ারি৷
এভাবে আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ স্বপ্নের বাস্তবায়ন হতে চলেছে প্রথমবার৷ এই উপলব্ধিা কাউকে বোঝানো যাবে না৷ বলা যেতে পারে, আমি প্রেস মিট-এ মানুষকে আমার ব্যাপারটা বোঝাতে পেরেছি এটাই বড়৷