‘নীল আকাশের নীচে এই পৃথিবী,
আর পৃথিবীর পরে ওই নীলাকাশ,’
এখন আমার অবস্থান অনুসারে গানটির কয়েকটি শব্দ পরিবর্তন হওয়া দরকার৷
নীল আকাশের নীচে ওই পৃথিবী,
আর পৃথিবীর পরে এই নীলাকাশ,
না ঠিক হল না!
নীল আকাশের পরে মেঘের আড়াল,
মেঘের আড়ালের ওপারে পৃথিবী৷
আজ জোহানাসবার্গ থেকে মুম্বাই-এর আকাশ পথের বেশির ভাগটাই মেঘ দিয়ে ঢাকা৷
রাম রাবণের যুগে এমন-ই মেঘের আড়াল থেকে যুদ্ধ করেছিল ইন্দ্রজিৎ, লক্ষণের সাথে৷
সেদিন ভগবান ছিলেন মাটিতে আর আকাশে ছিল শয়তান৷ আজ-ও কি তাই৷
আমার পাশে বসে থাকা সাদা চামড়ার সহযাত্রীটির ভারি হাত আমার ডান হাতটাকে এমন ভাবে কষে ধরেছে যে, তার নখগুলো তীক্ষ্ন ভাবে বিঁধছে আমার হাতে৷
ফ্লাইট প্যাসেঞ্জারদের মধ্যে এখন চরম উত্তেজলা৷
এয়ার হোস্টেসরা আপদকালীন পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমসিম৷ কিপ কাম-ডোন্ট প্যানিক-রিমুভ হাইহিল সিট-এ্যাডজাস্ট ইয়োর সিট ইন আপরাইট পজিশন---পুট ইওর লাইফ জ্যাকেট রাইট নাউ ইত্যাদি৷
প্লেনে কিছু যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিয়েছে৷ সবার ধারণা প্লেন ক্র্যাস হবে৷
কিন্তু, আমি জানি আমি সেফ ১০০ শতাংশ৷ গ্যারান্টির সাথে বলতে পারি৷
কীভাবে বুঝলাম !
পরে বলছি, ভারতের মাটিতে একটু পরে নামব৷
পাশে বসে থাকা সাদা চামড়ার ভদ্রলোকটিকে দেখে খুব মায়া লাগছে৷ ভদ্রলোক রীতিমত কান্নাকাটি সহকারে ইষ্ট দেবতাকে স্মরণ করছেন৷
---Hello Sir!
আমার Hello-টা ওর কানে গেল কিনা বুঝতে পারছি না৷ কারণ উনি আমার hello-তে কোন respond না করেই ইষ্ট দেবতাকে কল্পনা করে এখনো নাকের জলে চোখের জলে ভাসিয়ে তুলেছেন৷
–May I share a secret with you sir!
তথাপি আমি ওনার মনযোগ আকর্ষণ কতে পারলাম না৷ এই মুহূর্তে যেটা আমার কর্তব্য বলে মনে হচ্ছে, সেটা আমি করব, যদি প্লেন ক্র্যাস হয়৷ অন্তত একজন মানুষকে আমি বাঁচানোর চেষ্টা করব৷
আচ্ছা প্লেনটা যদি মাঝ আকাশে ভেঙ পড়ে, তখন আমাকে রক্ষা করার জন্য তিনি কীভাবে ব্যবস্থা রেখেছেন৷
আমার দেহের ওজন কি পাখির পালকের মত হয়ে যাবে!
আমি ভাসতে ভাসতে গিয়ে কি ভারতের ভূখণ্ডে পড়ব!
নাকি আমার নিজের ওজন নিয়েই পড়ব মহাসাগরে৷ সেখানে অপেক্ষা করে আছে এক বোট, যে আমাকে উদ্ধার করবে৷ যাইহোক, এ চিন্তা যাঁর তিনি-ই করুন, আমি আমার কর্তব্যে মন দিই---
জড়িয়ে ধরলাম পাশের ভদ্রলোকটিকে৷
---Keep calm, we are safe, don’t worry, the plane is going to land safely!
হঠাৎ এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল, প্লেনের ঝাঁকুনি থেমে গেল, আমাদের জানানো হল - সব কিছু ঠিক আছে৷ আমরা সুরক্ষিত৷ আর কিছুক্ষণের মধ্যে প্লেন মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজী এয়ারপোর্ট-এ নামতে চলেছে৷
ভদ্রলোক এখন ভীষণ উচ্ছ্বসিত৷ আমি যে এই ঘোর বিপদে তাঁকে সামলানোর চেষ্টা করেছি, সাহস জুগিয়েছি, তার জন্য তিনি হাত চেপে ধরে নিজের পরিচয় দিলেন...
—Hi, I am Cameron Batha, from Durban.
আমিও নিজের পরিচয় দিলাম৷
—Michael Tarun, A Citizen of the Earth.